ইসলামে স্বামী -স্ত্রীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতার প্রসঙ্গে যা বলা হয়েছে ।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মানব জাতির উভয় শ্রেণীর লিঙ্গের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হবে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার ভিত্তিতে। বৈবাহিকা সম্পর্কের সাথে সমাজ ও সভ্যতা যে সমস্ত উদ্দেশ্য সংযুক্ত রয়েছে সে গুলোকে তারা নিজেদের যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সফলতার সাথে পূর্ণ করতে পারবে এবং পারিবারিক জীবনে তারা শান্তি, আনন্দ ও আরাম উপভোগ করতে পারবে।
তাদের সামাজিক জীবনে মহান উদ্দেশ্য সমুহকে পূর্ণ করার জন্য শক্তি যোগাবার ক্ষেত্রে এসব জিনিষের খুবই প্রয়োজন। কুরআন মজিদে এ উদ্দেশ্যকে যে ভঙ্গিতে বর্ণনা করা হয়েছে তার ওপর চিন্তা করলে জানা যায় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য জীবনে দর্শনই হচ্ছে ভালোবাসা ও হৃদয়তা। স্বামী - স্ত্রীকে এই জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে যে, এক জন যেন অপর জনের কাছ থেকে শন্তি লাভ করতে পারে।
" এবং তার নির্দশনসমূহের মধ্য একটি নির্দশন হচ্ছে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তার কাছে মানসিক শান্তি লাভ করতে পার। আর তিনি তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন "। রুম-২১
" তিনি সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে একটি দেহ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য স্বয়ং সেই বস্তু থেকে তৈরি করেছেন একটি জোড়, যেন তোমরা তার কাছ থেকে শান্তি ও আরাম হাসিল করতে পার "। আরাফ-১৮৯
" তারা হচ্ছে তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা হচ্ছো তাদের জন্য পোশাক "। বাকারা-১৮৭
এখানে স্বামী - স্ত্রীকে পরস্পরের পোশাক বলা হয়েছে। পোশাক হচ্ছে যা মানুষের শরীরের সাথে মিশে থাকে, তাকে আবৃত করে রাখে এবং বাইরের অনিষ্টকর বস্তু থেকে হেফাযত করে। স্বামী- স্ত্রীর জন্য পোশাকের এরূপ ব্যবহার করে এটাই বোঝানোর উদ্দেশ্য যে, ব্যক্তিগত দিক থেকে তাদের মধ্যেকার দাম্পত্য সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত যেরূপ সম্পর্ক পোশাক ও শরীরের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।
তাদের অন্তর ও আত্না পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকবে। একে অপরের গোপনীয়তা রক্ষা করবে এবং একজন অপরজনের চরিত্র ও সম্ভ্রমকে কলঙ্কের প্রভাব থেকে বাচিয়ে রাখবে। এটায় হচ্ছে প্রেম ভালোবাসা ও আন্তরিকতার দাবি এবং ইসলামের দৃষ্টিকোন থেকে
এটাই হচ্ছে দাম্পত্য সম্পর্কের আসল প্রাণ। যদি কোন দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে এ প্রাণ বস্তু না থাকে তাহলে সেটা যেন এক প্রাণ হীন লাশ।
ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে সেখানে এই উদ্দেশ্যকে সামনে রাখা হয়েছে। যদি স্বামী- স্ত্রী একত্রে বসবাস করতে চাই তাহলে পরস্পরে সমঝোতা, মিল- মহব্বতের সাথে এক মুখী হয়ে বসবাস করবে। পরস্পরের ন্যায্য অধিকার আদায় করবে এবং উভয় উভয়ের সাথে উদার ব্যবহার করবে।
কিন্তু যদি তারা এরূপ করতে অসমর্থ হয়, তাহলে তাদের একত্রে বসবাস করার চেয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াই ভালো। কেননা প্রেম ও আন্তরিকতা ভাবধারা খতম হয়ে যাবার পর দাম্পত্য সম্পর্ক হবে একটি মৃত্যুদেহ।যদি তা দাফন না করা হয় তাহলে এ থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হবে এবং এর ফলে পারিবারিক জীবনে সমস্ত পরিবেশটা বিষময় হয়ে যাবে।
একারণে কুরআন মজীদ বলা হয়েছে ঃ
" যদি তোমরা আপোষে মিলেমিশে থাক এবং পরস্পরের সীমা লঙ্ঘন করা থেকে সতর্কতা অবলম্ব কর, তাহলে আল্লাহু নিশ্চয়ই ক্ষমাকারী ও দয়াশীল। যদি ( যদি তা সম্ভব না হয় ) দম্পতি পরস্পর পৃথক হয়ে যায় তাহলে আল্লাহু তায়ালা আপন অসীম অদৃশ্য ভান্ডার হতে উভয়কে সন্তুষ্টা করবেন"। নিছা:- ১২৯/১৩০
আবার জাগায় জাগায় আহ্কাম বর্ণনা করার সাথে সাথে তাগি করা হয়েছে যে,
" হয় ন্যায় সংগত পন্থায় তাকে ফিরিয়ে নেবে অথবা সৌজন্যের সাথে তাকে বিদায় দেবে "। বাকারা-২২৯
" হয় উত্তম ভাবে তাদের নিজের কাছে রাখবে অন্যথায় ন্যায়নীতি সাথে তাদের কাছে থেকে পৃথক হয়ে যাবে "। তালাক-২
" স্বীয় স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ কর"। নিছা-৩
" তোমরা হয় তাদের কে উত্তম পন্থায় ফিরিয়ে নাও অন্যথায় উত্তম পন্থায় বিদায় দাও। শুধু কষ্ট দেয়ার জন্য তাদের কে আটকে রেখ না। কেননা এতে তাদের অধিকার খর্ব হয়। যে ব্যক্তি এরূপ কাজ করবে সে নিজের ওপরই অত্যাচার করবে"। ( নাকারা - ২৩১)
" পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহৃদয়তা দেখাতে কখনো ভুলো করো না"। বাকারা-২৩৭
যেখানে 'রেযয়ী' (প্রত্যাহারযোগ্য) তালাকের বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে পুনরায় গ্রহণের জন্য সৎ উদ্দেশ্যের শর্ত আরোপ করা হয়েছে অর্থাৎ দুই তালাক দেয়ার পর এবং তৃতীয় তালাক দেয়ার পূর্বে স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ করবার অধিকার স্বামী রয়েছে। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য হতে হবে সমঝোতা, মিল- মহব্বত ও আন্তরিকতার সাথে বসবাস করা - যাতনা দেয়া এবং ঝুলিয়ে রাখার জন্য নয়।
কুরআন মজীদে বর্ণনা হয়েছে ঃ
" তাদের স্বামীরা যদি পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনে রাজী হয় তাহলে তারা এ অবকাশের মধ্যে তাদেরকে নিজেদের স্ত্রী রূপে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকারী হবে"। বাকারাহ- ২২৮।
-সাইয়েদ মওদূদী
স্বামী- স্ত্রীর অধিকার। প্রসঙ্গ - ভালোবাসা ও আন্তরিকতা।
Share This
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment